চীনের তাং ওয়াং প্রাসাদ 1905

চীনের তাং ওয়াং প্রাসাদে একদিন

 লিখেছেন : Md Nurer Sobah Razon 

খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০ অব্দ। রাজধানী শিয়ানের রাজপ্রাসাদের রাজসভায় বসে ঘামছেন তাং রাজবংশের সম্রাট গাওজং। নানা বিষয়ে তিনি চিন্তিত। চিন্তা হওয়ারই কথা তার পিতা সম্রাট তাইজং বিরাট সাম্রাজ্য রেখে গেছেন। সেটি পশ্চিমে তুর্কমেনিস্তান, উত্তরে মংগোলিয়া, দক্ষিণে ভিয়েতনামের সীমান্তপর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিশাল সাম্রাজ্য এখন তাকে রক্ষা করতে হবে!

সম্রাট বহুত পেরেশানীতে আছেন। ঘরে বাইরে সব জায়গায় তার সমস্যা। বাইরে সমস্যা তুর্কীরা জট পাকাচ্ছে। তাং সাম্রাজ্য আক্রমণের ছক কষছে। ভেতরে সমস্যা হল তার ডাকাবুকো বউ। তিনি আবার বউকে বেজায় ভয় পান। বলা চলে বউয়ের ভয়ে সর্বদা অস্থির থাকেন। দিনে দিনে বউয়ের অত্যাচার সীমা অতিক্রম করে চলেছে। ইদানিং তার বউ আবার রাজকার্যেও মাথা গলানো আরম্ভ করেছেন।

হাজার দুশ্চিন্তার মধ্যে সম্রাটের আপাত দুশ্চিন্তা হল তার চাচা! এই চাচা হল তার বাপের ভাই। সিংহাসনের প্রতি তার সামান্য লোভ আছে বলে শোনা যায়। সম্রাট তাকে সুঝৌতে পাঠিয়েছেন। সেখানে প্রাসাদ গড়ে দিয়েছেন। কিন্তু এতেও নাকি তার মন ভরছে না। সারাক্ষণ কি জানি কি চিন্তা করেন! কাজেকর্মে অস্থির অস্থির ভাব। এই চাচাকে শান্ত রাখতে হবে। নইলে কখন আবার শত্রুপক্ষের সাথে হাত মিলিয়ে বিদ্রোহ করে বসে!

এদিকে দক্ষিণ চীনের সাথে সম্রাটের বনিবনা খুব একটা ভাল না। এর কারণ যাতায়াতের দুর্গমতা। শিয়ান থেকে গুয়াংঝু, নানচাং, চাংশা এসব এলাকা বহু দুরে। দুই হাজার কিলোমিটার তো হবেই। তাই চীনের তাং রাজবশের সকল নিয়ম কানুন চীনের দক্ষিণে আসতে আসতে কমজোরি হয়ে যায়। দেখা যায় এইসকল অঞ্চলে কিছু কিছু জমিদার গজিয়ে গেছে। তারাই শাসন কাজ চালান। এলাকার মানুষের উপর মূল নিয়ন্ত্রণ তাদেরই। গাওজং শুধু নামে সম্রাট!

সম্রাট গাওজং তার চাচা লি ইয়েনইং কি পত্র লিখলেন, “প্রিয় চাচা, দুত মারফত খবর পেলাম আপনি সারাক্ষণ অস্থির থাকেন। দুনিয়াবী কাজেকর্মে মন বসে না। রাজকার্য তো দুরের কথা। আমি চিন্তা করছি আপনাকে দক্ষিণে পাঠাব। দক্ষিণের জল হাওয়া আপনার ভাল লাগবে। সেখানে খুব শীত ও না আবার গরম ও না। শিয়ানের মত রুক্ষও না। ছায়াসুনিবিড় সবুজ প্রকৃতি। আপনার ভাল লাগবে। সেখানে আপনার মনোরঞ্জন এর জন্য সকল ব্যবস্থা করে দেব। তাছাড়া দক্ষিণে আমাদের শাসনকার্য চালানোর জন্য আপনার মত যোগ্য লোকেরও দরকার আছে। আমি ঠিক করেছি সেখানে আমি আপনাকে আমার প্রতিনিধি করে পাঠাব। আমার হয়ে আপনি শাসনকাজ চালাবেন। এতে দুই পক্ষেরই সুবিধা!

পত্র পেয়ে ইয়েনইং খুশি। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। একদিন সুঝোউ থেকে বিশাল বহর নিয়ে দক্ষিণে রওনা দিলেন। বেশ কয়েকদিন হাটার পর গ্যানচিয়াং নদীর ধারে একটা জায়গা তার ভীষণ পছন্দ হয়ে গেল। তিনি ঠিক করলেন বাকি জীবন এখানেই কাটাবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। তিনি স্থানীয় লোকদের বললেন, তোমাদের যে সম্রাট সেই সম্রাটের আমি চাচা! মানে বাপের সমতুল্য। আমি এখানে এসেছি এই শহরের গভর্নর হয়ে। তোমরা আমার জন্য প্রাসাদ বানাও!

গোবেচারা সাধারণ জনগণ অক্লান্ত পরিশ্রম করে ইয়ানিং এর জন্য রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করে দিল। উদ্বোধন এর সময় সম্রাট গাওজং এর অনুমতি নেওয়া হল। গাওজং এই প্রাসাদের নাম রাখলেন তাং ওয়াং গা। মানে তাং রাজার প্রাসাদ। ইয়ানইং এর আলংকারিক নাম হল প্রিন্স তাং।

ইয়ানইং তথা প্রিন্স তাং নতুন এলাকায় এসে আকাশের চাদ হাতে পেলেন। প্রাসাদের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই দেখা যায় প্রমত্তা গ্যানচিয়াং নদী। নদীর পাড়ে ঘন সবুজ বন। সেই নদীতে পূর্নিমার চাদের আলোয় তাং ওয়াং প্রাসাদ অন্য রকম রূপ নেয়। ইয়ানইং এর এখন আর অস্থির লাগে না। তিনি আমোদে আছেন। সারাদিন কোন কাজকর্ম নেই। প্রাসাদের বাগানে বসে কবিতা লেখেন, গান লেখেন, সুর করেন। সন্ধ্যা হলে প্রাসাদে জলসা বসে। মদ খেয়ে চুর হয়ে ঢলাঢলি করেন! এভাবেই দিন যায়, মাস যায়।

ইয়ানইং এর এইসব কার্যকলাপ সম্রাট গাওজং এর অজানা থাকে না। সব খবরই তার কানে যায়। তিনি ভালোর জন্য চাচাকে নানচাং পাঠালেন। অথচ তিনি সেখানে গিয়ে হানিমুন করছেন! ইয়ানইং কে বরখাস্ত করা হল। তার ক্ষমতা চলে গেল। কিন্তু প্রাসাদের নাম আর চেঞ্জ হল না। এর নাম “তাং ওয়াং প্যাভেলিয়ন”ই থাকল।

এই তাং ওয়াং প্যাভেলিয়ন সমগ্র দক্ষিণ চীনের আজ পর্যন্ত টিকে থাকা ৩ টি সুউচ্চ প্রাসাদের মধ্যে অন্যতম। বলতে গেলে সবচেয়ে বিখ্যাত। আগুনে পুড়ে, বন্যায় ডুবে, যুদ্ধ -বিগ্রহে এই প্রাসাদ মোট ২৯ বার ধংস হয়েছে। একবার ধংস হয় আবার নির্মান করা হয়। সর্বশেষ চাইনিজ সিভিল ওয়ারে এটি পুরো মাটির সাথে মিশে যায়। তাং শিয়াওপিং ক্ষমতায় আসার পর মূল ডিজাইন অক্ষুণ্ণ রেখে এই প্রাসাদ কংক্রিটে আবার নির্মাণ করা হয়। ইয়ানইং এর সময় এই প্রাসাদ কাঠের তৈরি ছিল। এই কারণেই বহুবার এর বিনাশ হয়েছে।

নানচাং শহরের ল্যান্ডমার্ক এখন এই তাং ওয়াং প্যাভেলিয়ন। সেখানে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। দেশের সবার সাথে শেয়ার করার জন্য একটি ভিডিও তৈরি করলাম।

যেতে হলে কি করতে হবে:
১। চাইনিজ ট্রাভেল ভিসা লাগবে। দুই একটা দেশ ভ্রমণ করা থাকলে এই ভিসা পাওয়া সোজা।
২। ঢাকা থেকে নানচাং ফ্লাইট আছে। তবে মাঝপথে কুনমিং এ ট্রানজিট।
৩। এখানে প্রবেশমূল্য ৫০ ইউয়ান।
৪। নানচাং এ থাকা খাওয়ার খরচ খুবই কম। প্রায় ঢাকার মতই। এই প্যাভেলিয়ন ছাড়াই অনেক কিছু দেখার মত আছে এই শহরে। এখানে আছে দুনিয়ার ২য় বৃহত্তম নাগরদোলা। যেখানে উঠলে শহরের সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়।

যেখানেই ঘুরতে যান অবশ্যই পরিবেশের প্রতি খেয়াল রাখুন। ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।

 

এক্ষুনি কই যান এ সাবস্ক্রাইব করুন

দেশ বিদেশের ট্রাভেলিং এর খুঁটিনাটি, মজার মজার সব ভ্রমণ কাহিনী, ট্রাভেল টিপস, ভাড়া, গাইড, ১ দিনের ট্যুর, ৩ দিনের ট্যুর। এসব আপনার ইমেইল এ পেতে এক্ষুনি কই যান এ সাবস্ক্রাইব করুন

Thank you for subscribing.

Something went wrong.

Previous ArticleNext Article
কোই যান একটি ব্লগ, বাংলাদেশের সকল ভ্রমণ তথ্য এবং পরামর্শ একজায়গায় করার লক্ষে কোই যান এর যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালে। কই যান.কম বাংলাদেশের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় পর্যটন ও ভ্রমণ সম্পর্কিত ওয়েব সাইট। ভ্রমণের ক থেকে ‍ঁ জানতে আমাদের সাথেই থাকুন। লিখা সম্পর্কে যেকোনো পরামর্শ অথবা কপি রাইট এর বেপারে লিখুন : [email protected]

সর্বাধিক জনপ্রিয় বিষয়গুলি

আমাদের পছন্দের লিখা গুলি

এক্ষুনি কই যান এ সাবস্ক্রাইব করুন

দেশ বিদেশের ট্রাভেলিং এর খুঁটিনাটি, মজার মজার সব ভ্রমণ কাহিনী, ট্রাভেল টিপস, ভাড়া, গাইড, ১ দিনের ট্যুর, ৩ দিনের ট্যুর। এসব আপনার ইমেইল এ পেতে এক্ষুনি কই যান এ সাবস্ক্রাইব করুন

কই যান এ সাবস্ক্রাইব করার জন্য ধন্যবাদ

কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে

এক্ষুনি কই যান এ সাবস্ক্রাইব করুন

দেশ বিদেশের ট্রাভেলিং এর খুঁটিনাটি, মজার মজার সব ভ্রমণ কাহিনী, ট্রাভেল টিপস, ভাড়া, গাইড, ১ দিনের ট্যুর, ৩ দিনের ট্যুর। এসব আপনার ইমেইল এ পেতে এক্ষুনি কই যান এ সাবস্ক্রাইব করুন

কই যান এ সাবস্ক্রাইব করার জন্য ধন্যবাদ

কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে